- শিশু-কিশোর
- +
- অ
- -
১৯৭১
আমার বাড়ির পাশেই বাজারের কসাইখানা। সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিনই মোষ, গোরু, ছাগল জবাই হয়। এমনকি সপ্তাহের যে দু'দিন মাংসবিহীন থাকার কথা সে নিয়মও কেউ খুব কড়াকড়ি মানে না। মাঝে মাঝে হাড় জিরজিরে মৃতপ্রায় কিংবা চোরাই গোরু, এমনকি ভাগাড়ে যাওয়ার পথ থেকেও দু’-একটা কসাইখানায় চলে আসে। এসব অবশ্য শোনা কথা। তাই বলে বিক্রি না হয়ে দু’-চার টুকরো পড়ে থাকে এমনটিও কেউ কখনো দেখে নি।
বাড়ির পাশেই মিশনারী হাসপাতাল ও স্কুল। পাহাড়ের উপর বাংলোবাড়িতে ডাক্তারদের ঘর। পাশে কর্ণফুলী। কর্ণফুলীতে মিশেছে একটা ছড়া। এই ছড়া বা নদীর ওপারে বাজার, এপারে আমার বাড়ির পাশেই কসাইখানা।
মাঝে মাঝে আমি হাটে যাই। স্কুল ছুটির পর ঠাণ্ডা ভাত খেয়ে মুখ মুছতে মুছতে ছুটে যাই। হাট বলতে ছড়ার এপার বোঝায়। স্কুল ছুটির পর এমনিতেই প্রতিদিন যাই। বাবরি চুল, তাগড়া গোঁফ ও গালপট্টি অব্দি নামা মোটা জুলফিওয়ালা রইসউদ্দিনের দোকানে মাংস কিনতে যাই। কিনতে কিনতে দু’-চারটা কথা বলতে ভালো লাগে। মাংস কিমা করার সময় ওর হাত এত দ্রুত চলে যে মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে যাই আমি। হাত-কুড়োল দিয়ে বড় বড় হাড় কাটার সময় ওর চেহারা আরো ভয়ঙ্কর ও জ্বলজ্বলে হয়ে ওঠে। মাংসের গা থেকে অনাবশ্যক ফিনফিনে ছাঁটটুকু ছোরা দিয়ে কেটে ফেলে দেওয়ার সময় ওর হাতের দ্রুত গতিটাও দেখার মতো। আর সারাক্ষণ পান খাওয়ার জন্য ওর ফোলা ফোলা লাল-কালো ঠোঁট-দুটো-গাল-দুটো চোখ—ওই চেহারা ও তার এক ধরনের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আমাকে বার বার ওর দোকানে টেনে নিয়ে যায়। ওর গলাটাও অদ্ভুত রকম মোটা ও কর্কশ।
যে মাংসের ভাঁজের ভিতরে এক পরত কচকচ শক্ত চর্বি জমে থাকে তেমন খাসি বা গোরুর মাংসের প্রতি আমার বরাবরই লোভ। এজন্যই রইসউদ্দিনের সঙ্গে দু’-চার কথা বেশি বলি। ওর পেশিবহুল হাত, পেটানো শরীর, কাঠখোট্টা ব্যবহারের সঙ্গে পরিবেশটাও মনে রাখার মতো। চারদিকে জমাট রক্তের ঝাঁঝালো গন্ধ, মাংসলোভী কুকুরের জিভ বের করা হতচ্ছাড়া ভাব, জবাই করা গোরু-মোষের হজম না হওয়া পেটের ঘাসের স্তূপ—শুধু খারাপ লাগে ছিন্ন মুওটা যখন ভাটির মতো চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকে, কিংবা মাংস-মজ্জাহীন খুলিটা যখন এদিকে-সেদিক ছড়িয়ে পড়ে থাকে অথবা বাজারের চৌহদ্দির ঘেরার কঞ্চির উপর শিংসহ মুণ্ডটা যখন টাঙানো থাকে।
যুদ্ধের সময় পুরো জুন মাসটা গ্রামে আটকে পড়ি। কোথাও যেতে পারি নে, গ্রাম থেকে বেরিয়ে পালিয়ে যাব সে সুযোগটাও ছিল না। তখন রইসউদ্দিনের সঙ্গে মাংস বেচার কাজে লেগে যাই। আমার প্রথম কাজ ছিল গোরু বা ছাগলগুলো পিছনের ঘরের খুঁটি থেকে খুলে এনে ফাঁকা জায়গাটুকুতে নিয়ে আসা। একেক দিন দড়ি হাতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হত। রইসউদ্দিন তখন পান মুখে দিয়ে, একটা সিগারেট শেষ করা কিংবা ছোরাতে শান দিয়েই চলেছে। মাঝে মাঝে তখন মনে হত গোরুগুলোর মধ্যেও যেন রইসউদ্দিনের মতো রক্তের এক রকম নেশা ধরে গেছে। দু’-একটা মোষ নেশাগ্রস্তের মতো রক্তে ভেজা ঘাসগুলো খাবলে খেতে শুরু করত। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে দেখতাম কেমন করে গোরুগুলো ছোরার মুখে গলাটা বাড়িয়ে দিত। কোনো কোনোটা দাপাদাপি করত শেষ অবস্থায়ও। একদিন ওই অবস্থায় একটা পাহাড়ি মোষ দড়িদড়ার বাঁধন খুলে ছুটে পালাল। আমিও সব ভুলে রাস্তায় নেমে পড়লাম। সকলের সঙ্গে লাঠিসোটা নিয়ে মোষের পিছনে ছুটলাম। মোষের গলার চামড়ার এক পোচ মাত্র কাটা গেছে। সেই অবস্থায় মোষ শিং বাগিয়ে ছুটল। গলা বেয়ে রক্ত ঝরছে, মাঝে মাঝে হামলে দাঁড়িয়ে পড়ে, থুতনিটা একটু উঁচু করলেই ব্যথাটা টন টন করে ওঠে বোধ হয়। সেই অবস্থাতেই ঘরঘর কর্কশ আওয়াজ তোলে, গলা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়ে মাটিতে। সে বুঝতে পারে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
পড়ার জন্য প্রতিদিন নতুন কিছু
বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর আর্কাইভ
পুরনোর সঙ্গে থাকছে নতুন লেখাও
যোগাযোগ করতে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
সাহিত্যজগতে অনন্য প্রতিভা। সবসময়ই নিজের লেখা দিয়ে পাঠকের মন ছুঁয়েছেন, ভাবনা জাগিয়েছেন ভিন্নতার। মফস্বলে বেড়ে ওঠা। নিত্য দিনের জীবন থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে নিয়েছেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন হলেও তাঁর হৃদয়গ্রাহী বর্নণার মাধ্যমে জীবন, প্রকৃতির জীবন্ত এক চিত্রই পাঠকের সামনে হাজির করেন।
-
এক রাজার সাত রাণী। দেমাকে, বড়রাণীদের মাটিতে পা পড়ে না। ছোটরাণী খুব শান্ত। এজন্য রাজা ছোটরাণীকে সকলের চাইতে বেশি ভালবাসিতেন। কিন্তু, অনেক দিন পর্যন্ত রাজার ছেলেমেয়ে হয় না। এত বড় রাজ্য, কে ভোগ করিবে? রাজা মনের দুঃখে থাকেন।
এইরূপে দিন যায়। কতদিন পরে,—ছোটরাণীর ছেলে হইবে। রাজার মনে, আনন্দ ধরে না; পাইক-পিয়াদা ডাকিয়া, রাজা, রাজ্যে ঘোষণা করিয়া দিলেন,—"রাজা রাজভাণ্ডার খুলিয়া দিয়াছেন, মিঠাইমণ্ডা মণি-মাণিক যে যত পার, আসিয়া নিয়া যাও।
বড়রাণীরা হিংসায় জ্বলিয়া মরিতে লাগিল। রাজা আপনার কোমরে, ছোটরাণীর কোমরে, এক সোনার শিকল বাঁধিয়া দিয়া, বলিলেন,—"যখন ছেলে হইবে, এই শিকলে নাড়া দিও, আমি আসিয়া ছেলে দেখিব!" বলিয়া, রাজা, রাজদরবারে গেলেন।
ছোটরাণীর ছেলে
-
উত্তর থেকে বড়নদী দেখানে ব্রহ্মপুত্রের জলে এসে মিলেছে ঠিক সেই বাঁকের মুখেই কতকালের পুরানো ডিমরুয়ার আসামী রাজা আড়িমাওয়ের নাটবাড়ি। নাটবাড়ির নিচেই নদী মজে গিয়ে মস্ত চর পড়েছে। এত কাল থেকে হাড়গিলে পাখিরা এই চর দখল করে আছে যে, ক্রমে চরটার নামই হয়ে গেছে হাড়গিলার চর। এই চরের ওপারেই দেওয়ানগিরি মস্ত একটা বুড়ো আঙুলের মতো আকাশের দিকে ঠেলে উঠেচে। এই দেওয়ানগিরি হল যত ফরিয়াদি পাখির আড্ডা। একপারে রইল আসামী মাছেদের রাজা আড়িমাওয়ের নাটবাড়ি আর এক পারে দেওয়ানী ফরিয়াদির আড্ডা দেওয়ানগিরি, মাঝখানে বসে রয়েছেন হাড়গিলে। আসামী ফরিয়াদিতে লড়াই মোকদ্দমা প্রায়ই হয়, তাতে দুই দলই মাঝে-মাঝে মারা পড়ে।
হাড়গিলের খাম্বাজং রাজা দুই দলের
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.
Featured News
Advertisement
-
welcome
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
-
Thank you
- by bappi
- ১৫ Jan ২০২৬
-
good
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
Comments